রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া: বারবার ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও হাঁপিয়ে যাওয়ার পেছনে কী আছে?


পর্যাপ্ত ঘুমের পরও শরীর ক্লান্ত লাগে? সামান্য হাঁটলেই হাঁপিয়ে যান, মাথা ঘোরে কিংবা মুখ ফ্যাকাশে দেখায়? এসব লক্ষণের একটি সম্ভাব্য কারণ রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া। তবে একই উপসর্গ অন্য রোগেও হতে পারে—তাই পরীক্ষা ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

রক্তস্বল্পতা কেন হচ্ছে, সেটি জানা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু আয়রনের ওষুধ খেলে সব ধরনের অ্যানিমিয়া ভালো হয় না।

রক্তস্বল্পতা কী?

আমাদের রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় হিমোগ্লোবিন নামের একটি প্রোটিন থাকে। এটি ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।

হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বয়স, লিঙ্গ ও গর্ভাবস্থার উপযোগী সীমার নিচে নেমে গেলে অ্যানিমিয়া ধরা হয়। তখন শরীরের টিস্যুতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে সমস্যা হতে পারে। কথায় “রক্ত কম” বলা হলেও এর অর্থ সবসময় শরীরের মোট রক্তের পরিমাণ কমে যাওয়া নয়। 

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

রক্তস্বল্পতা ধীরে তৈরি হলে শুরুতে লক্ষণ খুব কম থাকতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • বারবার ক্লান্তি ও দুর্বলতা।
  • মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা।
  • পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত হাঁপিয়ে যাওয়া।
  • ত্বক, ঠোঁট বা চোখের পাতার ভেতর ফ্যাকাশে দেখানো।
  • হাত-পা ঠান্ডা লাগা।
  • বুক ধড়ফড় করা বা হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়া।

শুধু চেহারা দেখে রক্তস্বল্পতা নিশ্চিত করা যায় না। হালকা অ্যানিমিয়ায় কোনো লক্ষণও নাও থাকতে পারে। 

রক্তস্বল্পতা কেন হয়?

১. আয়রনের ঘাটতি

হিমোগ্লোবিন তৈরিতে আয়রন প্রয়োজন। খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন না থাকা, শরীরে আয়রন শোষণে সমস্যা অথবা দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ থেকে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

২. অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ

মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত, প্রসবের সময় রক্তক্ষরণ অথবা পাকস্থলী ও অন্ত্রের ভেতরের রক্তপাত থেকে অ্যানিমিয়া হতে পারে। শরীরের ভেতরের রক্তপাত সবসময় চোখে দেখা যায় না। 

৩. ভিটামিন বি১২ বা ফোলেটের ঘাটতি

সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে এই পুষ্টি উপাদানগুলোও দরকার। খাবারে ঘাটতি বা শোষণের সমস্যা হলে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। 

৪. দীর্ঘমেয়াদি রোগ

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, প্রদাহজনিত রোগ এবং কিছু সংক্রমণ রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। 

৫. বংশগত রক্তের রোগ

থ্যালাসেমিয়া ও সিকল সেল রোগের মতো বংশগত সমস্যাও অ্যানিমিয়ার কারণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসার ধরন আলাদা। 

কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?

রক্তস্বল্পতা যেকোনো বয়সে হতে পারে। বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার:

  • ছোট শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের।
  • যাঁদের মাসিকে বেশি রক্তপাত হয়।
  • গর্ভবতী ও সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের।
  • যাঁদের খাদ্যে আয়রন বা প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে।
  • কিডনি রোগ বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের।
  • যাঁদের পরিবারে বংশগত রক্তের রোগ আছে। 

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসক লক্ষণ, খাদ্যাভ্যাস, মাসিক বা অন্য রক্তপাত, চলমান ওষুধ এবং পারিবারিক রোগের ইতিহাস জানতে পারেন।

প্রাথমিকভাবে সাধারণত CBC বা Complete Blood Count করা হয়। এতে হিমোগ্লোবিন, লোহিত রক্তকণিকা এবং রক্তকণিকার আকার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। কারণ বুঝতে প্রয়োজন অনুযায়ী ফেরিটিন, ভিটামিন বি১২ বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে। 

রক্তপাতের সন্দেহ থাকলে তার উৎস খুঁজতেও পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। হিমোগ্লোবিন কম পাওয়া রোগ নির্ণয়ের শুরু; কেন কমেছে, সেটিও জানতে হবে। 

রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা কী?

চিকিৎসা নির্ভর করে কারণ, তীব্রতা ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর।

  • আয়রনের ঘাটতি হলে: চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন এবং ঘাটতির কারণের চিকিৎসা।
  • ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি হলে: প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট বা ইনজেকশন।
  • রক্তক্ষরণ হলে: রক্তপাত বন্ধ করা ও তার কারণের চিকিৎসা।
  • অন্য রোগের কারণে হলে: সেই রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা।
  • গুরুতর অ্যানিমিয়ায়: হাসপাতালে চিকিৎসা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। 

নিজে থেকে আয়রন শুরু করবেন না। আয়রনের ঘাটতি না থাকলে বাড়তি আয়রন উপকার নাও করতে পারে; অতিরিক্ত আয়রন শরীরের অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। 

খাবারে কী রাখবেন?

পুষ্টির ঘাটতি প্রতিরোধে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার সহায়ক। আয়রনের উৎস হিসেবে রাখা যায়:

  • ডাল, ছোলা ও শিমজাতীয় খাবার।
  • গাঢ় সবুজ শাকসবজি।
  • পরিমিত চর্বিহীন মাংস, মাছ বা মুরগি।
  • আয়রনসমৃদ্ধ বা আয়রন যোগ করা শস্যজাত খাবার।

উদ্ভিজ্জ আয়রন শোষণে সহায়তার জন্য একই খাবারের সঙ্গে লেবু, পেয়ারা, কমলা বা অন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল-সবজি রাখা যায়। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে চা-কফি খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ এগুলো আয়রন শোষণ কমাতে পারে। 

তবে রক্তস্বল্পতা ধরা পড়লে শুধু খাবার বদলেই চিকিৎসা সম্পূর্ণ হবে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ অনুযায়ী ওষুধ বা অন্য চিকিৎসাও লাগতে পারে। 

কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?

বুকব্যথা, বিশ্রামেও তীব্র শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া অথবা প্রচুর রক্তপাত হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। এসব লক্ষণকে সাধারণ দুর্বলতা ধরে অপেক্ষা করবেন না। গুরুতর অ্যানিমিয়ায় দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। 

যে ভুল ধারণাগুলো এড়িয়ে চলবেন

“দুর্বল লাগলেই অ্যানিমিয়া।”
দুর্বলতার অনেক কারণ আছে। রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

“সব অ্যানিমিয়ায় আয়রন খেলেই হবে।”
ভিটামিনের ঘাটতি, কিডনি রোগ বা বংশগত রোগের চিকিৎসা আলাদা।

“হিমোগ্লোবিন একটু বাড়লেই কারণ খোঁজার দরকার নেই।”
ভেতরে রক্তপাত বা অন্য রোগ থাকলে সেটির চিকিৎসাও জরুরি। 

দীর্ঘদিন ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা হাঁপিয়ে যাওয়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক কারণ শনাক্ত হলে অনেক ধরনের রক্তস্বল্পতার কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব। 

Post a Comment

0 Comments