ভূমিকম্প কেন হয়? মাটির নিচে কী ঘটলে কেঁপে ওঠে পৃথিবী?

ভূমিকম্প কেন হয়? মাটির নিচে কী ঘটলে কেঁপে ওঠে পৃথিবী?


নিশ্চিন্তে ঘরে বসে আছেন। হঠাৎ পায়ের নিচের মেঝে দুলতে শুরু করল। মাথার ওপরের বাতি নড়ছে, জানালার কাচ কাঁপছে। যে মাটিকে আমরা সব সময় স্থির ভাবি, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেটিই হয়ে উঠল অস্থির।

কিন্তু এই কম্পনের শুরু কোথায়? পৃথিবীর গভীরে এমন কী ঘটে, যার ধাক্কা পৌঁছে যায় আমাদের ঘরবাড়ি পর্যন্ত?

ভূমিকম্পের উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বিশাল শিলাস্তর, তাদের ধীর চলাচল এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তির মধ্যে।

পৃথিবীর বাইরের আবরণ আসলে চলমান

পৃথিবীর বাইরের শক্ত আবরণ একটি অখণ্ড খোলস নয়। ভূত্বক ও ম্যান্টলের ওপরের শক্ত অংশ মিলে তৈরি হয়েছে কয়েকটি বড় এবং অনেক ছোট টেকটোনিক প্লেট।

এই প্লেটগুলো খুব ধীরে সরে যায়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সেই গতি বোঝা যায় না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই চলাচল পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি বদলে দেয়।

কোথাও দুটি প্লেট পরস্পরের দিকে এগোয়, কোথাও দূরে সরে যায়, আবার কোথাও পাশাপাশি ঘষে চলতে থাকে। প্লেটগুলোর সীমানা এবং সংশ্লিষ্ট চ্যুতিগুলোতেই পৃথিবীর অধিকাংশ ভূমিকম্প ঘটে।

ধীরে চলা প্লেট হঠাৎ ভয়ংকর কম্পন তৈরি করে কীভাবে?

দুটি অমসৃণ পাথর একটির সঙ্গে আরেকটি চেপে ধরে সরানোর কথা ভাবুন। ঘর্ষণের কারণে প্রথমে আটকে থাকতে পারে। চাপ বাড়ালে একসময় হঠাৎ সরে যায়।

মাটির নিচেও কিছুটা এমন ঘটনা ঘটে।

শিলাস্তরের যে ভাঙন বরাবর দুই পাশের শিলা সরে যেতে পারে, তাকে বলা হয় চ্যুতি বা ফল্ট। ঘর্ষণের কারণে ফল্টের একটি অংশ আটকে থাকলেও আশপাশের প্লেটের চলাচল থামে না। ফলে শিলায় চাপ ও বিকৃতি জমতে থাকে।

একসময় সেই চাপ ঘর্ষণের বাধা অতিক্রম করলে শিলাখণ্ড হঠাৎ সরে যায়। জমে থাকা শক্তির একটি অংশ ভূকম্পীয় তরঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই তরঙ্গ মাটি কাঁপায়—আমরা অনুভব করি ভূমিকম্প।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও উপকেন্দ্র কী?

ভূমিকম্পের খবর শুনলে প্রায়ই দুটি শব্দ আসে—উৎপত্তিস্থল এবং উপকেন্দ্র।

মাটির নিচে যে স্থান থেকে ফল্টের হঠাৎ সরে যাওয়া শুরু হয়, সেটিই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা হাইপোসেন্টার।

সেই স্থানের ঠিক ওপরে ভূপৃষ্ঠের বিন্দুটিকে বলা হয় উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার।

অর্থাৎ, ভূমিকম্পের শুরু হয় গভীরে; উপকেন্দ্র হলো তার ওপরের ভৌগোলিক অবস্থান।

কম্পন দূরের শহরেও পৌঁছায় কেন?

ভূমিকম্পে মুক্ত হওয়া শক্তি উৎপত্তিস্থলে আটকে থাকে না। ভূকম্পীয় তরঙ্গের মাধ্যমে তা আশপাশের শিলাস্তর পেরিয়ে দূরে ছড়িয়ে যায়।

এই তরঙ্গের কয়েকটি ধরন আছে:

  • পি-তরঙ্গ: সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছায়। চলার পথে পদার্থকে সামনে-পেছনে সংকুচিত ও প্রসারিত করে।

  • এস-তরঙ্গ: পি-তরঙ্গের পরে আসে। এর কম্পন তরঙ্গের চলার দিকের আড়াআড়ি হয়।

  • পৃষ্ঠতরঙ্গ: ভূপৃষ্ঠ বরাবর ছড়িয়ে পড়ে এবং শক্তিশালী ভূমিকম্পে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।

এই কারণেই মাটির গভীরে শুরু হওয়া একটি ঘটনা অনেক দূরের মানুষের কাছেও অনুভূত হতে পারে।

ভূমিকম্পের মাত্রা আর অনুভূত তীব্রতা কি এক?

একটি ভূমিকম্পের মাত্রা একটি নির্দিষ্ট মান হলেও সব জায়গায় মানুষ একই রকম কাঁপুনি অনুভব করে না।

ম্যাগনিটিউড বা মাত্রা বোঝায় ভূমিকম্পটির সামগ্রিক আকার। বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বর্তমানে মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড বহুল ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে, ইনটেনসিটি বা তীব্রতা বোঝায় কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কতটা কাঁপুনি অনুভূত হয়েছে এবং কী ধরনের প্রভাব পড়েছে।

তাই একই ভূমিকম্পে একটি এলাকায় তীব্র কাঁপুনি হতে পারে, অন্য এলাকায় অনুভূত হতে পারে হালকা দুলুনি। সংবাদে সব মাত্রাকে সাধারণভাবে “রিখটার স্কেল” বলা হলেও আধুনিক পরিমাপে একাধিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।

একবার কাঁপার পর আবার কেন কাঁপে?

বড় ভূমিকম্পের পরে ফল্ট ও আশপাশের শিলাস্তরে চাপের বিন্যাস বদলে যায়। এর সঙ্গে সম্পর্কিত পরবর্তী ভূমিকম্পগুলোকে বলা হয় পরাঘাত বা আফটারশক।

পরাঘাত কয়েক মিনিট পরেই হতে পারে, আবার দিন, সপ্তাহ বা মাস ধরেও চলতে পারে। সাধারণত সময়ের সঙ্গে এগুলোর সংখ্যা কমে আসে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের জন্য পরাঘাতও বিপজ্জনক হতে পারে।

ভূমিকম্প কি আগে থেকে জানা সম্ভব?

বর্তমানে কোনো ভূমিকম্পের সঠিক সময়, নির্দিষ্ট স্থান এবং মাত্রা একসঙ্গে নির্ভরযোগ্যভাবে বলে দেওয়ার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই।

বিজ্ঞানীরা কোনো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা হিসাব করতে পারেন। কিন্তু “আগামীকাল এই সময়ে এই শহরে এত মাত্রার ভূমিকম্প হবে”—এমন নিশ্চিত দাবি করার সুযোগ নেই।

ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা বিষয়টি আলাদা। এই ব্যবস্থা ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পরে তা দ্রুত শনাক্ত করে। শক্তিশালী কাঁপুনি কোনো এলাকায় পৌঁছানোর আগে সেখানে কয়েক সেকেন্ডের সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এটি ভূমিকম্পের ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

ভূমিকম্পের সময় কী করবেন?

কাঁপুনি শুরু হলে দ্রুত নিজের মাথা ও ঘাড় রক্ষা করুন। ঘরের ভেতরে থাকলে সাধারণ নির্দেশনা হলো নিচু হন, আড়াল নিন এবং ধরে থাকুন—Drop, Cover, Hold On।

১. হাত ও হাঁটু মাটিতে রেখে নিচু হন, যাতে ধাক্কায় পড়ে না যান।
২. কাছাকাছি মজবুত টেবিল থাকলে নিচে আশ্রয় নিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢাকুন।
৩. টেবিল ধরে থাকুন এবং কাঁপুনি থামা পর্যন্ত আশ্রয়ে থাকুন।

জানালা, কাচ ও পড়ে যেতে পারে এমন ভারী আসবাব থেকে দূরে থাকুন। কাঁপতে থাকা ভবন থেকে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা বা বাইরে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। বাইরে থাকলে ভবন, বিদ্যুতের তার এবং পড়ে যেতে পারে এমন জিনিস থেকে দূরে খোলা জায়গায় থাকুন।

পায়ের নিচের মাটি স্থির মনে হলেও পৃথিবীর বাইরের আবরণ ধীরে ধীরে বদলে চলেছে। সেই চলাচলে শিলার মধ্যে জমে থাকা শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে কয়েক মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে আমাদের চারপাশ।

ভূমিকম্পের সময় নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে এর বিজ্ঞান জানা, নিরাপদ ভবন তৈরি এবং সঠিক আচরণের অনুশীলন মানুষকে আরও প্রস্তুত থাকতে সাহায্য করে।

Ruhani World-এর সঙ্গে থাকুন—সহজ বাংলায় জানুন পৃথিবী ও বিজ্ঞানের বিস্ময়।

Post a Comment

0 Comments