পেপটিক আলসার: কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা

পেপটিক আলসার: পেটের ওপরের দিকে ব্যথা কেন হয়? কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা


পেটের ওপরের দিকে বারবার জ্বালাপোড়া বা ব্যথা হচ্ছে? অল্প খেলেই পেট ভরে যাচ্ছে, সঙ্গে বমিভাব বা পেট ফাঁপা? এসব উপসর্গ পেপটিক আলসারে দেখা দিতে পারে। তবে একই সমস্যা অন্য রোগেও হয়—তাই শুধু লক্ষণ দেখে আলসার নিশ্চিত করা যায় না। 

রক্তবমি, কালো আলকাতরার মতো পায়খানা অথবা হঠাৎ তীব্র ও স্থায়ী পেটব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। এগুলো আলসারের জটিলতার লক্ষণ হতে পারে। 

পেপটিক আলসার কী?

পাকস্থলী অথবা ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ—ডুওডেনামের ভেতরের আবরণে ক্ষত তৈরি হলে তাকে পেপটিক আলসার বলে।

পাকস্থলীতে হলে গ্যাস্ট্রিক আলসার, আর ডুওডেনামে হলে ডুওডেনাল আলসার বলা হয়। চিকিৎসা না হলে ক্ষত থেকে রক্তপাত, ছিদ্র বা খাবার চলাচলে বাধা তৈরি হতে পারে। 

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • পেটের ওপরের দিকে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া।
  • অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া।
  • খাওয়ার পর অস্বস্তিকর ভরা ভাব।
  • বমিভাব বা বমি।
  • পেট ফাঁপা ও ঢেকুর।

কারও খালি পেটে বা রাতে ব্যথা বাড়ে; খাবার খেলে সাময়িক কমতে পারে। আবার কারও খাওয়ার পর ব্যথা বাড়ে। ব্যথার এই ধরন দিয়ে একা রোগ নির্ণয় করা যায় না। কিছু আলসারে জটিলতা হওয়ার আগ পর্যন্ত লক্ষণও থাকে না। 

আলসারের প্রধান কারণ কী?

১. H. pylori সংক্রমণ

হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি বা H. pylori নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ পেপটিক আলসারের অন্যতম প্রধান কারণ।

২. কিছু ব্যথার ওষুধ

আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন ও অ্যাসপিরিনের মতো NSAID ওষুধ পাকস্থলীর আবরণে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত ব্যবহারের ইতিহাস চিকিৎসককে জানানো জরুরি। 

আগে আলসার হওয়া, বেশি বয়স এবং ধূমপানের অভ্যাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে। 

ঝাল খাবার কি আলসার তৈরি করে?

ঝাল খাবারকে প্রায়ই আলসারের প্রধান কারণ বলা হয়। কিন্তু পেপটিক আলসারের সবচেয়ে পরিচিত কারণ হলো H. pylori ও NSAID ওষুধ।

বিশেষ কোনো খাদ্যতালিকা দিয়ে আলসার সারানো বা প্রতিরোধের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তবে যে খাবার বা পানীয় আপনার অস্বস্তি বাড়ায়, তা কমানো উপসর্গ সামলাতে সাহায্য করতে পারে। খাবারের পরিবর্তন প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প নয়। 

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসক ব্যথার ইতিহাস, আগের আলসার, চলমান ওষুধ এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা হতে পারে:

  • ইউরিয়া ব্রেথ টেস্ট: H. pylori সংক্রমণ খুঁজতে।
  • মলের পরীক্ষা: H. pylori শনাক্ত করতে।
  • রক্ত পরীক্ষা: রক্তস্বল্পতা বা অন্য জটিলতা মূল্যায়নে।
  • এন্ডোস্কপি: পাকস্থলী ও ডুওডেনামের ভেতরের আবরণ দেখতে; প্রয়োজনে ছোট টিস্যুর নমুনা নেওয়া হয়।

সব রোগীর একই পরীক্ষা লাগে না। 

চিকিৎসা কীভাবে হয়?

H. pylori থাকলে: চিকিৎসক একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যাসিড কমানোর ওষুধের সমন্বয় দেন; কখনো বিসমাথও থাকে। কোন ওষুধ লাগবে, তা আগের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়।

ব্যথার ওষুধের কারণে হলে: চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট ওষুধ বন্ধ, পরিবর্তন বা ডোজ কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। হার্টের জন্য নির্ধারিত অ্যাসপিরিনসহ কোনো নিয়মিত ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ না করে পরামর্শ নিন।

ক্ষত সারাতে: PPI বা অন্য অ্যাসিড কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা হয়। রক্তপাত বা ছিদ্রের মতো জটিলতায় হাসপাতালে চিকিৎসা লাগে। 

ভালো লাগলেই কি ওষুধ বন্ধ করা যায়?

ব্যথা কমে গেলেও H. pylori সম্পূর্ণ দূর হয়েছে—এমন ধরে নেওয়া যায় না। নির্ধারিত চিকিৎসা সম্পূর্ণ করুন।

সংক্রমণ দূর হয়েছে কি না নিশ্চিত করতে অ্যান্টিবায়োটিক শেষ হওয়ার অন্তত চার সপ্তাহ পরে পুনরায় পরীক্ষা লাগতে পারে। পরীক্ষার প্রস্তুতি ও ওষুধের সময়সূচি চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। 

দৈনন্দিন যত্নে কী করবেন?

  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া NSAID ব্যথার ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
  • ধূমপান ছাড়ুন; এটি ক্ষত সারতে দেরি করাতে পারে।
  • যে খাবারে সমস্যা বাড়ে, তা চিহ্নিত করুন।
  • একবারে বেশি খেয়ে অস্বস্তি হলে ছোট পরিমাণে খান।
  • উপসর্গ ফিরে এলে বা না কমলে আবার চিকিৎসক দেখান। 

কখন দ্রুত চিকিৎসক দেখাবেন?

পেটব্যথা বাড়তে থাকলে, বারবার বমি হলে, ক্ষুধা কমে গেলে, অল্পতেই পেট ভরে গেলে বা অকারণে ওজন কমলে দ্রুত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

আর রক্তবমি, কালো পায়খানা, হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণে জরুরি চিকিৎসা নিন। 

GERD আর আলসার কি একই?

একই রোগ নয়। GERD-তে পাকস্থলীর উপাদান খাদ্যনালিতে ফিরে আসে। পেপটিক আলসারে পাকস্থলী বা ডুওডেনামের আবরণে ক্ষত থাকে। কিছু উপসর্গ মিলতে পারে, তাই বারবার সমস্যা হলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন। 

Post a Comment

0 Comments