শিলাবৃষ্টি কেন হয়? গরমের দিনেও আকাশ থেকে বরফ পড়ে কীভাবে?
মাটিতে এত গরম, অথচ আকাশ থেকে বরফ পড়ছে—এটা কীভাবে সম্ভব? উত্তরটা আছে ঝড়ের মেঘের অনেক ওপরে, যেখানে বাতাস এত ঠান্ডা যে বরফ জমতে পারে।
ঝড়ের মেঘের ভেতরে শিলা তৈরি হয় কীভাবে?
বজ্রঝড়ের মেঘে বাতাসের একটি শক্তিশালী স্রোত নিচ থেকে ওপরে ওঠে। আবহাওয়াবিজ্ঞানে একে আপড্রাফট (updraft) বলে। এই স্রোত পানির ফোঁটা ও ছোট বরফকণাকে মেঘের ঠান্ডা অংশে তুলে নিয়ে যায়।
সেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে হলেও কিছু পানির ফোঁটা তরল অবস্থায় থাকে। এগুলোকে বলা হয় অতিশীতল পানির ফোঁটা। এমন ফোঁটা ছোট কোনো বরফকণার গায়ে লাগলে জমে যায়। একের পর এক ফোঁটা জমতে জমতে ছোট কণাটি বড় শিলায় পরিণত হয়।
কিছু শিলা ছোট, কিছু বড় হয় কেন?
একটি শিলার আকার অনেকটাই নির্ভর করে মেঘের ঠান্ডা অংশে সেটি কতক্ষণ থাকে এবং পথে কতটা তরল পানি পায়। শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ শিলাকে বেশি সময় ওপরে রাখতে পারে। এতে তার গায়ে আরও ফোঁটা জমার সুযোগ পায়।
শিলা বড় হতে হতে একসময় এত ভারী হয় যে বাতাসের স্রোত আর তাকে ওপরে ধরে রাখতে পারে না। আবার বাতাসের স্রোত দুর্বল হলেও শিলা নিচে পড়তে শুরু করতে পারে। মেঘের ভেতরে বরফ তৈরি হলেও নিচে নামার পথে তা পুরোপুরি গলে গেলে মাটিতে আর শিলা হিসেবে পৌঁছায় না।
শিলা কাটলে পেঁয়াজের মতো স্তর দেখা যায় কেন?
কিছু বড় শিলা মাঝখান দিয়ে কাটলে স্বচ্ছ আর ঘোলাটে বরফের আলাদা স্তর দেখা যায়। এর কারণ, মেঘের সব অংশে তাপমাত্রা ও পানির পরিমাণ এক রকম থাকে না।
শিলার গায়ে পানি খুব দ্রুত জমে গেলে ছোট বায়ুর বুদ্বুদ বরফের মধ্যে আটকে পড়ে। তখন স্তরটি সাদা বা ঘোলাটে দেখায়। পানি ধীরে জমলে বুদ্বুদ বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়, তাই বরফ তুলনামূলক স্বচ্ছ হয়।
একটি শিলা মেঘের ভেতর দিয়ে চলার সময় ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার মুখোমুখি হলে তার গায়ে দুই ধরনের স্তরই তৈরি হতে পারে।
গরমের দিনেও বরফ মাটি পর্যন্ত পৌঁছায় কীভাবে?
মাটির কাছের তাপমাত্রা দিয়ে মেঘের ওপরের তাপমাত্রা বোঝা যায় না। নিচে গরম থাকলেও উঁচু ঝড়ের মেঘে বরফ তৈরির মতো ঠান্ডা থাকতে পারে।
শিলা নিচে নামার সময় উষ্ণ বাতাসের মধ্যে দিয়ে যায় এবং গলতে শুরু করতে পারে। কিন্তু মাটি ছোঁয়ার আগে পুরোটা গলে যাওয়ার মতো সময় না পেলে তার কিছু অংশ বরফ হিসেবেই পৌঁছায়। এ কারণেই গরমের দিনে একই ঝড়ে বৃষ্টির ফোঁটা আর শিলা একসঙ্গে পড়তে দেখা যায়।
শিলাবৃষ্টি আর তুষারপাতের পার্থক্য কী?
তুষার তৈরি হয় যখন জলীয় বাষ্প বরফের স্ফটিকে পরিণত হয়। সেই স্ফটিকগুলো একসঙ্গে জুড়ে হালকা তুষারকণা তৈরি করতে পারে।
শিলা বড় হয় অন্যভাবে। বজ্রঝড়ের মেঘে ছোট বরফকণার গায়ে তরল পানির ফোঁটা জমে শক্ত বরফের দলা তৈরি করে। তাই একটি তুষারকণা আর একটি শিলার গঠন ও চেহারা আলাদা।
পরেরবার শিলাবৃষ্টির শব্দ শুনলে ভাবুন, বরফের ছোট্ট টুকরোটি মেঘের ভেতরে একসময় ছিল সামান্য একটি কণা। ঝড়ের বাতাস তাকে ওপরে ধরে রেখেছিল, আর ফোঁটা ফোঁটা পানি জমে তাকে বড় করেছিল। মাটিতে যে বরফটা কয়েক মিনিটেই গলে যায়, তার গল্প শুরু হয়েছিল আকাশের অনেক ওপরে।
Ruhani World-এর সঙ্গে থাকুন—সহজ বাংলায় জানুন প্রতিদিনের প্রকৃতির পেছনের বিজ্ঞান।
রংধনু কীভাবে তৈরি হয়? বৃষ্টির পরে আকাশে সাত রং দেখা যায় কেন?
এই রংগুলো আসে কোথা থেকে? বৃষ্টির পানিতে কি রং মেশানো থাকে? আর রংধনুর কাছে যেতে চাইলে সেটি দূরেই থেকে যায় কেন?
উত্তর লুকিয়ে আছে সূর্যের আলো, বাতাসে ভেসে থাকা পানির ফোঁটা এবং আপনার দেখার অবস্থানের মধ্যে।
সূর্যের আলোতে রং লুকিয়ে থাকে
সূর্যের আলো আমাদের চোখে প্রায় সাদা দেখায়। কিন্তু এর মধ্যে দৃশ্যমান বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো মিশে থাকে। চোখে সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন রং হিসেবে ধরা পড়ে।
এই মিশ্র আলো পানির ফোঁটার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন রং কিছুটা আলাদা দিকে বেঁকে যায়। ফলে সাদা আলো থেকে রঙের বিস্তার দেখা সম্ভব হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় আলোর বিচ্ছুরণ বা বর্ণবিচ্ছেদ।
পানির ফোঁটার ভেতরে কী ঘটে?
একটি বৃষ্টির ফোঁটা দিয়ে সূর্যের আলোর যাত্রা কল্পনা করুন। প্রধান রংধনু তৈরির ক্ষেত্রে আলো সাধারণত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার হয়।
প্রথমে আলো ফোঁটায় ঢুকে বাঁকে।
বাতাস থেকে পানিতে প্রবেশের সময় আলোর গতি ও দিক বদলায়। দিক বদলানোর এই ঘটনাকে বলে প্রতিসরণ। বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো সমানভাবে বাঁকে না।
এরপর ফোঁটার ভেতরে প্রতিফলন ঘটে।
আলোর একটি অংশ ফোঁটার পেছনের ভেতরের পৃষ্ঠ থেকে ফিরে আসে।
শেষে আলো ফোঁটা ছেড়ে বেরিয়ে আবার বাঁকে।
বের হওয়ার সময় আরও একবার প্রতিসরণ ঘটে। উপযুক্ত কোণে বেরিয়ে আসা রঙিন আলো আপনার চোখে পৌঁছালে রংধনুর অংশ হিসেবে দেখা যায়। প্রধান রংধনু তৈরিতে ফোঁটার ভেতরে একবার প্রতিফলন ঘটে।
একটি ফোঁটা একা পুরো রংধনু তৈরি করে না। অসংখ্য ফোঁটা থেকে আপনার চোখে পৌঁছানো আলো মিলেই বড় রঙিন বাঁকটি দৃশ্যমান করে।
রংধনুতে কি ঠিক সাতটি রং থাকে?
ছোটবেলায় আমরা রংধনুর সাতটি রঙের নাম শিখি—লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, ঘন নীল ও বেগুনি।
এটি রংগুলো মনে রাখার একটি পরিচিত পদ্ধতি। বাস্তবে রংধনুতে রঙের পরিবর্তন ধারাবাহিক। এক রং থেকে আরেক রঙে যাওয়ার মাঝে শক্ত কোনো দেয়াল বা সীমানা নেই।
তাই রংধনুকে সাতটি আলাদা রঙের ফিতার বদলে একটি ধারাবাহিক বর্ণালি হিসেবে ভাবা বেশি সঠিক।
লাল বাইরে, বেগুনি ভেতরে কেন?
প্রধান রংধনুতে লাল রং বাইরের প্রান্তে এবং বেগুনি ভেতরের প্রান্তে থাকে।
পানির মধ্যে বিভিন্ন রঙের আলো ভিন্ন পরিমাণে বেঁকে যায় বলে সেগুলো ফোঁটা থেকে একটু ভিন্ন কোণে বের হয়। এই কোণের পার্থক্যই রংগুলোকে নির্দিষ্ট ক্রমে সাজিয়ে দেয়।
রংধনু দেখতে সূর্য পেছনে থাকতে হয় কেন?
সাধারণ রংধনু দেখতে সূর্য থাকে আপনার পেছনে, আর আলো পাওয়া পানির ফোঁটাগুলো থাকে সামনের দিকে।
সূর্যের আলো সামনের ফোঁটায় ঢুকে প্রতিসরণ ও প্রতিফলনের পর আপনার দিকে ফিরে আসে। তাই সূর্যের বিপরীত দিকের আকাশে রংধনু দেখা যায়।
বৃষ্টির পর সূর্য উঠলেই যে রংধনু দেখা যাবে, এমন নয়। সূর্য, পানির ফোঁটা ও দর্শকের অবস্থানের মিল দরকার।
রংধনু বাঁকা হয় কেন?
আপনার চোখে সব ফোঁটা থেকে একইভাবে রঙিন আলো পৌঁছায় না। নির্দিষ্ট কোণে থাকা ফোঁটাগুলো থেকে আসা আলো রংধনুকে উজ্জ্বল করে তোলে।
এই উপযুক্ত কোণের অবস্থানগুলো আপনার দৃষ্টির চারদিকে বৃত্ত তৈরি করে। মাটি থেকে সাধারণত সেই বৃত্তের ওপরের অংশ দেখা যায়, তাই রংধনুকে ধনুকের মতো মনে হয়।
উঁচু অবস্থান থেকে নিচেও পর্যাপ্ত পানির ফোঁটা দেখা গেলে কখনো পূর্ণ বৃত্তাকার রংধনু দেখা সম্ভব।
রংধনুর শেষ প্রান্তে পৌঁছানো যায় না কেন?
দূর থেকে মনে হতে পারে রংধনু কোনো মাঠে বা পাহাড়ের পেছনে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু সেটি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বস্তু নয়।
আপনার অবস্থান অনুযায়ী নির্দিষ্ট ফোঁটা থেকে আসা আলো আপনার চোখে রংধনু তৈরি করছে। আপনি সরে গেলে উপযুক্ত কোণে থাকা ফোঁটাগুলোর অবস্থানও বদলে যায়।
তাই হাঁটতে হাঁটতে রংধনুর নিচে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও তার কোনো স্থির শেষ প্রান্ত খুঁজে পাবেন না। পাশাপাশি দাঁড়ানো দুই দর্শকের চোখেও একেবারে একই ফোঁটা থেকে আলো পৌঁছায় না।
একসঙ্গে দুটি রংধনু দেখা যায় কেন?
কখনো উজ্জ্বল রংধনুর বাইরে আরও একটি হালকা রঙিন বাঁক দেখা যায়। একে বলে দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি রংধনু।
এক্ষেত্রে আলো পানির ফোঁটার ভেতরে দুবার প্রতিফলিত হয়ে বের হয়। অতিরিক্ত প্রতিফলনের ফলে আলোর যাত্রাপথ বদলে যায় এবং দ্বিতীয় রংধনু তুলনামূলক ফিকে দেখা যায়।
এর রঙের ক্রমও উল্টো হয়। দ্বিতীয় রংধনুতে লাল থাকে ভেতরের দিকে এবং বেগুনি বাইরের দিকে।
বৃষ্টি ছাড়াও কি রংধনু দেখা যায়?
হ্যাঁ। বাতাসে উপযুক্ত পানির ফোঁটা এবং সঠিক দিক থেকে আলো থাকলেই রংধনুর মতো বর্ণালি দেখা যেতে পারে।
তাই জলপ্রপাতের ছিটায়, ঝরনার পাশে বা সূক্ষ্ম পানির স্প্রেতেও রঙিন বাঁক দেখা যায়। সেখানে একই মূল প্রক্রিয়া কাজ করে—পানির ফোঁটায় আলোর প্রতিসরণ, প্রতিফলন এবং রঙের পৃথক হওয়া।
পরেরবার বৃষ্টির পরে রংধনু দেখলে খেয়াল করুন—সূর্য কোন দিকে, মেঘ কোথায় এবং রংগুলো কোন ক্রমে সাজানো।
যে পানির ফোঁটা কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে পড়ছিল, সেই ফোঁটাই সূর্যের আলোকে ভেঙে আপনার চোখের সামনে তৈরি করছে প্রকৃতির সবচেয়ে পরিচিত রঙিন বিস্ময়গুলোর একটি।
Ruhani World-এর সঙ্গে থাকুন—সহজ বাংলায় জানুন প্রতিদিনের প্রকৃতির পেছনের বিজ্ঞান।


0 Comments
Thank you for visiting Ruhani World! We appreciate your thoughts and questions. Please keep your comments respectful, helpful, and relevant. Let's learn, share knowledge, and grow together.