হাইপোথাইরয়েডিজম ও মাইগ্রেন: লক্ষণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা | মানবজীবন ও রোগ পর্ব ১৪–১৫

মানবজীবন ও রোগ 
হাইপোথাইরয়েডিজম: থাইরয়েড হরমোন কমে গেলে কী হয়?


আগের চেয়ে বেশি ঠান্ডা লাগছে, দিনের কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য বা ত্বক শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে? এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে দেখা দিলে একটি সম্ভাব্য কারণ হলো হাইপোথাইরয়েডিজম। এতে থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করে। একই লক্ষণ অন্য কারণেও দেখা দিতে পারে, তাই রোগ শনাক্ত করতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও রক্ত পরীক্ষা দরকার। 

থাইরয়েড হরমোনের কাজ কী?

থাইরয়েড হলো গলার সামনের দিকে থাকা প্রজাপতির মতো ছোট একটি গ্রন্থি। এর হরমোন শরীর কীভাবে শক্তি ব্যবহার করে, তা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শরীরের তাপমাত্রা ও হৃদ্‌যন্ত্রের কাজেও এই হরমোনের ভূমিকা আছে। হরমোনের ঘাটতি হলে শরীরের নানা কাজ ধীর হয়ে যেতে পারে। সে কারণেই একই ব্যক্তির মধ্যে ক্লান্তি, ঠান্ডা লাগা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। 

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

লক্ষণ সাধারণত ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং শুরুতে হালকা থাকতে পারে। পরিচিত লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে। 

  • অতিরিক্ত ক্লান্তি ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডা লাগা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য ও ওজন বেড়ে যাওয়া
  • ত্বক ও চুল শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা চুল পড়া
  • মনোযোগ দিতে অসুবিধা বা মন খারাপ থাকা
  • কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া
  • মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রক্তপাত

থাইরয়েড হরমোন কেন কমে যায়?

একটি সাধারণ কারণ হাশিমোটো রোগ। এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করে। সময়ের সঙ্গে গ্রন্থিটির হরমোন তৈরির ক্ষমতা কমতে পারে। থাইরয়েড অপারেশন, রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন দিয়ে চিকিৎসা, থাইরয়েডে প্রদাহ বা কিছু ওষুধের কারণেও হরমোন কমে যেতে পারে। চিকিৎসকের কাছে গেলে আগে নেওয়া থাইরয়েড চিকিৎসা এবং বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধ ও সাপ্লিমেন্টের কথা জানান। 

কোন পরীক্ষায় ধরা পড়ে?

চিকিৎসক লক্ষণ ও চিকিৎসার ইতিহাস জেনে সাধারণত TSH ও ফ্রি T4 (FT4) রক্ত পরীক্ষার ফল দেখেন। TSH হলো পিটুইটারি গ্রন্থির তৈরি একটি হরমোন, যা থাইরয়েডকে হরমোন তৈরির সংকেত দেয়। সমস্যা থাইরয়েড গ্রন্থিতে হলে সাধারণত TSH বেশি ও FT4 কম থাকে। কখনও TSH বেশি থাকলেও FT4 স্বাভাবিক থাকে। একে সাবক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। এ ক্ষেত্রে ওষুধ দরকার কি না, চিকিৎসক পরীক্ষার ফল ও ব্যক্তির পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঠিক করেন। হাশিমোটো রোগ সন্দেহ হলে থাইরয়েডের অ্যান্টিবডি পরীক্ষাও করা হতে পারে। 

চিকিৎসা কীভাবে হয়?

হরমোনের ঘাটতি পূরণে সাধারণত লেভোথাইরক্সিন (Levothyroxine) দেওয়া হয়। এটি শরীরের তৈরি T4 হরমোনের বিকল্প। চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষার ফল দেখে ওষুধের ডোজ ঠিক করেন। চিকিৎসা শুরু করার পর এবং ডোজ পরিবর্তনের পরে আবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। অনেকের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দরকার হয়। 

ওষুধ প্রতিদিন নির্ধারিত নিয়মে নিন এবং ডোজ বদলানো বা বন্ধ করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। আয়রন ও ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট লেভোথাইরক্সিনের শোষণ কমাতে পারে। এগুলো ব্যবহার করলে ওষুধের সঙ্গে কতটা সময়ের ব্যবধান রাখতে হবে, চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নিন। আয়োডিন বা কেল্প সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগেও পরামর্শ নিন। অতিরিক্ত আয়োডিন কিছু মানুষের থাইরয়েডের সমস্যা বাড়াতে পারে। 

গর্ভাবস্থায় কী খেয়াল রাখবেন?

আগে থেকেই হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে গর্ভধারণের পরিকল্পনার সময় চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। গর্ভধারণের খবর জানার পর দ্রুত চিকিৎসককে জানান, কারণ লেভোথাইরক্সিনের ডোজ ও রক্ত পরীক্ষার সময়সূচি বদলাতে হতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশে লেভোথাইরক্সিন গর্ভাবস্থায় নেওয়া যায়। চিকিৎসা না হলে গর্ভপাত ও সময়ের আগে প্রসবের ঝুঁকি বাড়তে পারে। 

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

ক্লান্তি, বেশি ঠান্ডা লাগা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে, বিশেষ করে কয়েকটি লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। কখন থেকে লক্ষণগুলো শুরু হয়েছে, কীভাবে বদলেছে এবং কী কী ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নিচ্ছেন, তা জানালে চিকিৎসক পরবর্তী পরীক্ষা ঠিক করতে পারবেন। 

মানবজীবন ও রোগ 

মাইগ্রেন: মাথায় ধকধক ব্যথা আর আলো সহ্য না হলে কী করবেন?


মাথার এক পাশে ধকধক করছে। আলো জ্বালালে অস্বস্তি হচ্ছে, হাঁটাচলা করলে ব্যথা বাড়ছে, সঙ্গে বমি বমি ভাব। এমন অভিজ্ঞতা বারবার হলে তার একটি সম্ভাব্য কারণ মাইগ্রেন। কারও ব্যথা এক পাশে হয়, কারও দুই পাশেই হয়। আবার কিছু মানুষের মাথাব্যথা ছাড়াও মাইগ্রেনের অন্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। 

মাইগ্রেনের লক্ষণ কী?

মাইগ্রেন সাধারণত পর্ব আকারে আসে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ছাড়া বা চিকিৎসায় কাজ না হলে মাথাব্যথা সাধারণত ৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। ব্যথার সঙ্গে যে লক্ষণগুলো বেশি দেখা যায়, সেগুলো হলো বমি বমি ভাব বা বমি এবং আলো ও শব্দে অস্বস্তি। হাঁটা বা সিঁড়ি ওঠার মতো সাধারণ কাজেও ব্যথা বাড়তে পারে। কারও কারও মাথাব্যথা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ক্লান্তি বা ঘন ঘন হাই ওঠে। 

‘অরা’ কী?

কিছু মানুষের মাইগ্রেনের আগে বা সঙ্গে সাময়িক কিছু উপসর্গ হয়, যাকে অরা (aura) বলে। চোখের সামনে ঝলকানি বা আঁকাবাঁকা রেখা দেখা, শরীরের কোনো অংশে ঝিনঝিন করা বা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া এর উদাহরণ। সাধারণত অরা ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং প্রতিটি উপসর্গ ৫ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে সেরে যায়। হঠাৎ কথা জড়িয়ে গেলে, মুখ বেঁকে গেলে বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। আগে মাইগ্রেন হয়ে থাকলেও এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না। 

কীসে মাইগ্রেনের পর্ব শুরু হতে পারে?

ঘুমের অনিয়ম, মানসিক চাপ, খাবার বাদ দেওয়া বা মাসিকের সময় হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে কারও কারও মাইগ্রেনের পর্বের সম্পর্ক থাকতে পারে। কোন পরিস্থিতির পর বারবার ব্যথা হচ্ছে, তা বোঝার জন্য মাথাব্যথার ডায়েরি রাখুন। ব্যথা কখন শুরু হলো, কতক্ষণ থাকল, কতটা তীব্র ছিল, সঙ্গে কী উপসর্গ ছিল এবং কোন ওষুধ নিয়েছেন, তা লিখে রাখুন। এই তথ্য চিকিৎসককে মাথাব্যথার ধরন বুঝতে ও চিকিৎসার ফল মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে। 

রোগ কীভাবে শনাক্ত হয়?

চিকিৎসক সাধারণত ব্যথার ধরন, কতবার হয়, কতক্ষণ থাকে এবং সঙ্গে কী লক্ষণ দেখা দেয়, তা জেনে মাইগ্রেন শনাক্ত করেন। পরিচিত ধরনের মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে সাধারণত মাথার স্ক্যানের প্রয়োজন হয় না। তবে মাথাব্যথার ধরন বদলে গেলে বা সতর্কসংকেত দেখা দিলে চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দিতে পারেন। 

ব্যথা উঠলে কী করবেন?

আলো ও শব্দে অস্বস্তি হলে শান্ত, অন্ধকার ঘরে বিশ্রাম নিতে পারেন। নিয়মিত ঘুম, সময়মতো খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পান দৈনন্দিনভাবে মাইগ্রেন সামলাতে সাহায্য করতে পারে। পর্বের সময় চিকিৎসক উপযুক্ত ব্যথানাশক, মাইগ্রেনের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ বা বমি কমানোর ওষুধ দিতে পারেন। পর্ব ঘন ঘন হলে বা কাজকর্মে বড় প্রভাব ফেললে, পর্বের সংখ্যা কমানোর জন্য প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিয়েও আলোচনা করা যায়। মাথাব্যথার ওষুধ খুব ঘন ঘন নিলে উল্টো মাথাব্যথা আরও ঘন হতে পারে। বারবার ওষুধের দরকার হলে চিকিৎসককে জানান। 

কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?

মাথাব্যথার সঙ্গে নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন। 

  • হঠাৎ শুরু হওয়া অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা, যা কয়েক মিনিটের মধ্যে চরমে পৌঁছায়
  • মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ কথা বলতে অসুবিধা
  • খিঁচুনি, নতুন বিভ্রান্তি বা হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি হারানো
  • তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া

মাথাব্যথা বারবার ফিরে এলে, আগের চেয়ে বেড়ে গেলে বা কাজ ও ঘুমে বাধা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। মাথাব্যথার ডায়েরি থাকলে সঙ্গে নিন। 

Post a Comment

0 Comments